ঝিকরগাছায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক : ঋণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি
আফজাল হোসেন চাঁদ, ঝিকরগাছা : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক (৪৬০৫) শাখায় ঋণ বিতরণকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে শার্শা উপজেলা শাখা ব্যবস্থাপক সালমা খাতুন এবং মাঠকর্মী তাপস পাল। তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত দরিদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বঞ্চিত করে আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঋণ বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যাংকের ঋণ তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। অথচ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন। অভিযোগ উঠেছে, সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত করে ঋণের অর্থ চলে গেছে বিত্তবানদের হাতে। সালমা খাতুন ২২/১০/২০১৮ ইং তারিখে ঝিকরগাছা শাখায় যোগদান করেন এবং ২৭/১১/২০২২ ইং পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালীন সময়ে ১৯/০৬/২০২২ ইং তারিখে তার আত্মীয় নাসিমা বেগম (সদস্য নং ৪১২৩৩৫৩৭০৩০) এর নামে ১ লক্ষ টাকা এবং রাবেয়া বেগম (সদস্য নং ৪১২৩৩৫৩৭০১৫) এর নামে ১ লক্ষ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। এছাড়াও ০৪/০৮/২০২২ ইং তারিখে মোজাম্মেল বিশ্বাস (সদস্য নং ৪১২৩৩৫০৬১০১৭), জান্নাতুল নাহার মোহনা (সদস্য নং ৪১২৩৩৫০৬১০৩৬) এবং ছবিরন বেগম (সদস্য নং ৪১২৩৩৫০৬১০৫৯) এর নামে যথাক্রমে ১ লক্ষ, ১ লক্ষ এবং ৫০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। দুই দফায় মোট ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রাবেয়া বেগম ও তার মেয়ে ছবিরন বেগম অফিসে উপস্থিত না হয়েই তাদের নামে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই অর্থ সালমা খাতুনের আত্মীয় মোজাম্মেল বিশ্বাসের কাছে গেছে। এছাড়াও জান্নাতুল নাহার মোহনা ২৬/০২/২০২৬ ইং তারিখে মাত্র ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। সংবাদকর্মীদের অনুসন্ধানের পর গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাবেয়া বেগম ও তার মেয়ে ছবিরন বেগমের ঋণ পরিশোধ করা হলেও বাকি তিনজনের ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে বলে অফিস সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রাহকের অজান্তেই তাদের নামে ঋণ তোলা হয়েছে। তারা বলেন, “আমরা কোনো সংস্থা থেকে টাকা নিলে আমাদের জেল খাটতে হয়, কিন্তু এখানে আত্মীয়তার মাধ্যমে প্রায় চার বছর ধরে টাকা উত্তোলন করে তা হজম করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।” তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
রাবেয়া বেগম বলেন, “আমি কোনো লোন নেয়নি। কে কী করেছে আমি জানি না। আমি ওই অফিসেই কোনোদিন যাইনি।” তবে পরবর্তীতে তিনি বলেন, “আমাদের সাথে তাদের রাগারাগি ছিল, তাই এমন বলেছিলাম। এখন লোন শোধ করে দিয়েছি।”
মোজাম্মেল বিশ্বাস বলেন, “আমি লোন নিয়েছি। আমিই শোধ করবো। কে তথ্য দিয়েছে সেটা বলেন, আমি দেখছি।”
মাঠকর্মী তাপস পাল বলেন, “আমাদের সালমা ম্যাডাম ছিলেন। উনার আত্মীয় দোলাভাই আপন। বস যদি বলে, তাহলে তো দিতে হয়।” রাবেয়ার উপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, “তারা অবশ্যই এসেছিল।”
সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক সালমা খাতুন বলেন, “লোন দিয়েছি। লোন কি পরিশোধ হবে না? তারা অস্বীকার করছে না। অডিট টিম আছে, তারা ব্যবস্থা নেবে।” আত্মীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তারা আমার আত্মীয়। তবে অফিসিয়ালি তারা সমিতির গ্রাহক। এক পরিবারে একাধিক ঋণ দেওয়ার কোনো বাধা তখন ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “রাবেয়া ও তার মেয়ের বিষয়টি পারিবারিক সমস্যা। তারা একসাথে থাকাকালীন ঋণ নিয়েছিল, পরে আলাদা হয়ে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখন আমার দোলাভাই বলছে, সে ঋণ পরিশোধ করবে।”
বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “আগে নিয়ম ভিন্ন ছিল, পরে এক পরিবারে একজনের নীতিমালা এসেছে। এখন মূল বিষয় হলো খেলাপি ঋণ আদায়। ৫ জনের মধ্যে ২ জনের টাকা পরিশোধ হয়েছে, আর ৩ জনের টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে।”
জেলা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সিনিয়র অফিসার মো. জাকির হুসাইন বলেন, “বিষয়টি জানা আছে। তারা দ্রুত পরিশোধ করবে বলেছে। না করলে তাদের বাধ্য করা হবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শেখ নাজমুল ইসলাম| অফিস ঠিকানা: মহাকবি মাইকেল মধুসূদন সড়ক তালা সাতক্ষীরা ফোন নং ০১৭১১৭ ৯৮৬২২ ইমেইলঃ daink71bangla@gmail.com
ইপেপার