ঝিকরগাছা হাসপাতালে ইসিজি কেলেঙ্কারি : তদন্ত শেষ হলেও নীরব কর্তৃপক্ষ, ধামাচাপার অভিযোগ

ঝিকরগাছা হাসপাতালে ইসিজি কেলেঙ্কারি : তদন্ত শেষ হলেও নীরব কর্তৃপক্ষ, ধামাচাপার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্ডিওগ্রাফার (ইসিজি টেশনিশিয়ান) রিয়াজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ হয়। অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর সাংবাদিক আফজাল হোসেন চাঁদকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কার্ডিওগ্রাফার তিনি নিজে, তার স্ত্রী ও তার বন্ধুবান্ধব দিয়ে অশালীন মন্তব্যের ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ করার পরে ০৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। গঠিত তদন্ত কমিটির দেওয়া নির্ধারিত সময়ে কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের নামে দায়সারা প্রক্রিয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। তদন্তের চ‚ড়ান্ত ফলাফল আসার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ অদৃশ্য কারণে নীরব ভ‚মিকা পালন করছে, যা স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে পবিত্র ঈদুল আযহার সরকারি ছুটির ঠিক আগমুহূর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা চরম বিপাকে পড়েন। ইসিজি করতে গিয়ে রোগীরা বিভাগে গিয়ে দেখেন সংশ্লিষ্ট কার্ডিওগ্রাফার (ইসিজি টেশনিশিয়ান) রিয়াজুল ইসলাম কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অথচ দপ্তরে কোনো ছুটির আবেদন বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই অনিয়মের খবর পেয়ে ২৫ মে ২০২৬ তারিখে ‘দৈনিক সত্যপাঠ’সহ স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে “ঝিকরগাছা হাসপাতালে ছুটির আবেদন নেই, কর্মস্থলেও দেখা নেই: রিয়াজুলের খেয়ালখুশিতে চলে ইসিজি কার্যক্রম” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্ত রিয়াজুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে এবং সংবাদকর্মীর আইডিতে সাংবাদিক সমাজকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও মানহানিকর মন্তব্য পোস্ট করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১ জুন ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী সাংবাদিক আফজাল হোসেন চাঁদ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়াও উক্ত অভিযোগের অনুলিপি সিভিল সার্জন, যশোর ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ঝিকরগাছাকে দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে ৪ জুন ২০২৬ তারিখে স্মারক নং-উস্বাকম:/ঝিকরগাছা/যশোর/২৬/১৬১৮ মূলে তদন্ত বোর্ডের সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য অভিযোগকারীকে নোটিশ প্রদান করেন সহকারী অধ্যাপক সুপার নিউমারারী (মেডিসিন) ডা. মো. রফিকুজ্জামান। সর্বশেষ ৬ জুন ২০২৬ তারিখে তদন্ত বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী ব্যক্তির সাথে আলোচনার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর নিকট লিখিত জবানবন্দী চাওয়া হয়। তদন্ত বোর্ডের জবানবন্দীতে ভুক্তভোগী শাকিল হোসেন তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তার অভিযোগ, রিয়াজুল ইসলাম দায়িত্ব পালন না করায় ইসিজি কার্যক্রম চরমভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল। অদ্ভুত বিষয় হলো, রিয়াজুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে হাসপাতালের একজন হেলথ সহকারী শোভাকে দিয়ে ইসিজি পরীক্ষা করানো হচ্ছিল। প্রশ্ন উঠেছে, একজন টেকনিশিয়ানের বৈধ কাগজপত্র বা প্রয়োজনীয় কারিগরি সনদ ছাড়া একজন হেলথ সহকারী কীভাবে রোগীর ইসিজি রিপোর্ট প্রস্তুত করার মতো সংবেদনশীল কাজ করেন? এটি একজন সাধারণ রোগীর স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি তামাশা এবং সরকারি চিকিৎসা বিধি লঙ্ঘনের শামিল। ভুক্তভোগীদের মতে, জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য কর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, বরং এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। রিয়াজুল ইসলামের খেয়ালখুশিতে চলা এই অব্যবস্থাপনা হাসপাতালের সামগ্রিক সেবার ভাবমূর্তি ধ্বংস করছে। অভিযুক্ত রিয়াজুল ইসলাম সরকারি শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন। তার কর্মকাÐ কেবল প্রশাসনিক অপরাধ নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিক সমাজকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সাইবার নিরাপত্তা আইনেরও পরিপন্থী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অভিযোগকারী আফজাল হোসেন চাঁদ জানান, প্রথমে তদন্ত বোর্ড কর্তৃক আমাকে চিঠি দিয়ে হাসপাতালে ডাকেন। আমি যথারীতি সময়ে উপস্থিত হলে তদন্ত বোর্ড আমার ও ভুক্তভোগী ব্যক্তির সাথে আলাপ আলোচনা করে ভুক্তভোগীর নিকট থেকে লিখিত জবানবন্দী চান। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর লিখিত জবানবন্দী দেওয়া হয়। তারপরেও তদন্ত বোর্ডের এক সদস্য উপজেলা স্যানেটারী ইন্সপেক্টর আব্দুল মতিন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নাম্বার থেকে পুনরায় তদন্তের জন্য ডাকেন। এরপর তার ডাকে সাড়া দিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হলে তদন্ত কমিটির নেতৃবৃন্দ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টির যথাযথ বিচার বা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কোনো আপস-মীমাংসায় রাজি না হয়ে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আমি চলে আসি। পরবর্তীতে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও কর্তৃপক্ষরা অভিযুক্ত রিয়াজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বিষয়টিকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তদন্ত বোর্ডের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক সুপার নিউমারারী (মেডিসিন) ডা. মো. রফিকুজ্জামান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আমাদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রশিদ বলেন, এই বিষেয়ে তাকে শোকজ করা হয়েছে। সে জবাব দিয়েছে। জবাবের কপি জেলায় উর্দ্ধতন কর্মকর্তার নিকট পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাফফাত আরা সাঈদ বলেন, ঘটনার বিষয়ে হাসপাতালের পক্ষে আমার নিকট কোন তদন্ত প্রতিবেদন আসেনি। আসলে আমি ব্যবস্থা নিবো।দ
সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, তাকে সর্তক করা হয়েছে। তবে সর্তকের বিষয়ে অভিযোগকারীকে তো কোন কিছু জানানো হয়নি। এই জবাবে তিনি বলেন, ইউএইচএফপিও এর সাথে যোগাযোগ করেন। আর এই বিষয়ে ক্ষুব্ধ হলে মামলা করেন।
সচেতন সাংবাদিক মহল, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দাবি জানিয়েছেন, হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অনতিবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযুক্ত রিয়াজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সাধারণ রোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
