ঝিকরগাছায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের শ্লীলতাহানির অভিযোগের পর ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে

ঝিকরগাছায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের শ্লীলতাহানির অভিযোগের পর ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে
আফজাল হোসেন চাঁদ, ঝিকরগাছা : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ২নং মাগুরা ইউনিয়নের জয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর সবুরের বিরুদ্ধে একাধিক কোমলমতি ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত শিক্ষকের কর্মকাণ্ডের নানা দিক প্রকাশ পাওয়ায় তাঁর ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে| এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীর অভিযোগ ছিল, তিনি তাদের চুম্বন করতেন, শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে হত্যার হুমকি দিতেন। অভিযোগের পর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করে| উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওয়ালীয়ার রহমান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়ভাবে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর সবুর স্ত্রীর চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করেন। আবেদনটি সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম কিবরিয়ার মাধ্যমে করা হয়। তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওই আবেদনের সঙ্গে স্ত্রীর চিকিৎসার কোনো চিকিৎসাপত্র বা সমর্থনকারী নথি সংযুক্ত করা হয়নি। এরপর তিন দিনের ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আরও ১৫ দিনের চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদন করেন। ওই আবেদনের সঙ্গে তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. হাসান আরিফুর রহমানের ওয়াপদা রোডস্থ এস. কে. ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকের চেম্বারের প্যাডে ইস্যুকৃত একটি মেডিকেল সনদ দাখিল করেন। সেখানে তাঁর গোড়ালি মচকে যাওয়া (Ankle Sprain) এবং প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসে আক্রান্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়| পরবর্তীতে মেডিকেল সনদের অনুলিপি সংবাদকর্মীদের হাতে এলে দেখা যায়, সনদে ব্যবহৃত তারিখের একাধিক স্থানে ওভাররাইটিং রয়েছে। এছাড়া সনদে ৩১/০৬/২০২৬ তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও জুন মাসে ৩১ দিন নেই। বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ওঠে, এমন একটি সনদের ভিত্তিতে কীভাবে চিকিৎসাজনিত ছুটি অনুমোদন করা হলো ?
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রকাশের পর অভিযুক্ত শিক্ষক প্রথমে স্ত্রীর চিকিৎসার অজুহাতে ছুটি নেন, পরে নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদন করেন। এরপর তাঁর জমা দেওয়া মেডিকেল সনদে তারিখের অসংগতি সামনে আসায় নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও অভিযুক্ত শিক্ষককে বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাদের দাবি, শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিভাগীয় কার্যক্রম নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা এবং তাঁর জমা দেওয়া মেডিকেল সনদের সত্যতা সম্পর্কেও নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্লীলতাহানির অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি ছুটির আবেদন ও মেডিকেল সনদে উঠে আসা অসংগতির বিষয়টিও প্রশাসনের গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত। দুটি বিষয়েই স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে জনমনে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নেরও সুষ্ঠ উত্তর মিলবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওয়ালীয়ার রহমান বলেন, “বিষয়টি আগে আমার নজরে আসেনি। এখন যেহেতু বিষয়টি জানতে পেরেছি, তিনি কেন এমনটি করেছেন, সে বিষয়ে তাঁকে অফিসিয়ালি শোকজ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।”
