​ধানের রাজ্য নিয়ামতপুরে অসময়ের তরমুজে বিপ্লব,ঝুঁকিমুক্ত চাষে দ্বিগুণ লাভে তরুণরা

জাকির হোসেন
​নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধিঃ

​ধানের চিরচেনা ফসলি মাঠ। দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের শীষের সুবাস ছাড়িয়ে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এখন নতুন সুবাস ছড়াচ্ছে সুমিষ্ট গ্রীষ্মকালীন তরমুজ। ধান চাষে অভ্যস্ত এই জনপদে শঙ্কা ও সংশয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসময়ে তরমুজ ফলিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন একদল উদ্যোমী তরুণ। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করা এই পরীক্ষামূলক চাষ এখন এলাকার কৃষকদের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

​উপজেলার মাকলাহাট গ্রামের কৃষক জহির রায়হান শামীম (৩০) গত বছর ইউটিউবে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষের একটি ভিডিও দেখেন। ধানের বাইরে অন্য ফসল ফলানোর ভয় ও সামাজিক শঙ্কা জয় করে তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে মাচায় তরমুজ চাষ করেন। এর মধ্যে দেড় বিঘা নিজের এবং দুই বিঘা জমি বর্গা নেন।

​আধুনিক এই পদ্ধতিতে মাটিতে পচনশীল পলিথিন বা মালচিং কাগজ ব্যবহার করা হয়, যার রুপালি পাশ ওপরে থাকায় প্রখর রোদেও মাটির আর্দ্রতা অক্ষুণ্ণ থাকে, আগাছা জন্মায় না এবং পোকামাকড়ের উপদ্রবও কমে যায়। বগুড়ার এগ্রিওয়ান কোম্পানি থেকে ‘স্মার্টবয়’ জাতের বীজ এনে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে রোপণ করেন শামীম। মাত্র ৬২ দিনের মাথায় ফল কেটে বিক্রির উপযোগী হয়।

​প্রতি বিঘা জমিতে শতাধিক মণ ফলন পাওয়া গেছে। একেকটি তরমুজ তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের হয়েছে, যার সর্বোচ্চ ওজন ছয় কেজি পর্যন্ত ঠেকেছে। বর্তমানে প্রতি মণ তরমুজ ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও দিনাজপুর থেকে আসা পাইকাররা খেত থেকেই এসব তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে সঠিক সময়ে সার প্রয়োগের জটিলতা ও সার সংকট নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে তাঁর। একই জমিতে প্রতিবছর এই চাষ করা যাবে না বলেও তিনি অন্যান্য কৃষকদের সতর্ক করেন।

​শামীমের দেখাদেখি এলাকার মাহফুজ আলম ও ফারুক হোসেনও বর্গা জমিতে এই তরমুজ চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। আড়াই বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করা মাহফুজ আলম জানান, ধান উৎপাদনে চার মাস সময় লাগলেও গ্রীষ্মকালীন তরমুজে সময় লাগে মাত্র দুই মাস। বিঘাপ্রতি প্রায় এক লাখ টাকা খরচ বাদ দিয়ে দ্বিগুণের বেশি লাভ আশা করছেন তিনি। তাঁর মতে, উপযুক্ত জ্ঞান ও প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করে এই চাষে নামা ঠিক হবে না।
​এ বিষয়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত রাজশাহীর সফল কৃষক মনিরুজ্জামান মনে করেন, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্থায়ী বিপণন ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যা চাষিদের আরও বেশি উৎসাহী করবে।

​নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে বাজারজাত উপযোগী হওয়ায় এই তরমুজে কৃষকদের লাভ অনেক বেশি। ধানের পাশাপাশি নিয়ামতপুরে এখন গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষের অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের পরামর্শ, সহযোগিতা ও প্রণোদনা অব্যাহত রয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ