শিশু রিক্তা লাশ হয়ে বাড়ী ফিরলো

মো:গোলাম কিবরিয়া
রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি

বাবা দিন মজুরের কাজ করে । সংসারে অভাব অনটন এর কারণে , একটু ভাল থাকার , জন্য ঢাকায় এক প্রকৌশলী বাড়ীতে ছোট শিশু রিক্তাকে প্রকৌশলী বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে রাখে দিনমজুর শাহীন ।
সুনামগঞ্জের সালনা থানার নিজগাঁও গ্রামের রিক্তা, পুরো নাম রিক্তা মনি। চার বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পিতা দিনমজুর শাহিন মিয়া, মাতা মাজেদা বেগম। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা মেটাতে বাবা রিক্তাকে মাসিক ৪ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠান ঢাকার ধানমন্ডিতে। গৃহকর্তা সবিবুর রহমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী, গৃহকর্ত্রী নুসরাত বর্নি। রিক্তা যখন গৃহকর্মীর কাজে যোগ দেয়, তখন তার বয়স ১২ বছর।
তবে এই নিয়োগে ছিলো একাধিক দালাল বা ফরিয়া। রিক্তার বাবার পরিচিত গাজিবুর, তার পরিচিত আইয়ুব আলী… এই দুজনের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের রিক্তা মনি ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডিতে কাজ পায়। এর বিনিময়ে আইয়ুব আলী আর গাজিবুর পায় ১০ হাজার টাকা।
কয়দিন পরেই ইমোতে কল করলে রিক্তা কান্নাকাটি করে শারীরিক নির্যাতনের কথা জানায় মাকে। তখন তার চোখ মুখ ফোলা ছিলো। গৃহকর্ত্রী বর্নি ফোন কেড়ে নেয়। মাজেদা বিষয়টি স্বামীকে জানান।
পিতা শাহীন গৃহকর্ত্রী বর্নিকে ফোন করে কন্যা রিক্তাকে ফেরত চাইলে বর্নি বলে রিক্তাকে ফেরত চাইলে দালালদেরকে দেওয়া ১০ হাজার টাকাও তাকে ফেরত দিতে হবে। বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে বর্নি।
এক পর্যায়ে এতেও রাজী হয় শাহিন। গত ১৮ জুন মা মাজেদা ফোন করলে বর্ণি বলে পরদিন সকালে ফোন দিলে রিক্তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে।
পরদিন ১৯ জুন সকাল ৭টায় দালাল গাজিবুর শাহিন মিয়াকে ফোন করে জানায় রিক্তা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে উত্তরায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে। মাজেদা আর গাজিবুর সেখানে গিয়ে বর্নিকে ফোন করলে বর্নি তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলে ফোন কেটে দেয়, তারপর ফোন বন্ধ করে দেয়।
দুই ঘন্টা পর আরেক দালাল আইয়ুব আলী ফোনে গাজিবুরকে জানায় যে রিক্তা ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। মাজেদা আর গাজিবুর সেখানে গিয়ে দেখে রিক্তা মনির লাশ অ্যাম্বুলেন্সে রাখা। রিক্তার বাম হাত ভেঙে মাংসপেশি ছিঁড়ে হাড় বেরিয়ে গেছে।
তখন পিতা শাহিন মিয়া ধানমন্ডিতে গিয়ে জানতে পারেন ভোর ৬টায় ধানমন্ডির ৯/এ সড়কের ১১ তলা বাসার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে গেছে। অভিযোগ ওঠে রিক্তাকে নির্যাতন ও হত্যা করে লাশ রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় পাউবোর প্রকৌশলী সবিবুর আর বর্নির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন দিনমজুর শাহিন। দুই আসামীকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর জুলাইয়ের ৭ তারিখে তারা জামিনে মুক্তি পান। বাদীপক্ষ আদালতে হাজির হয়ে বলেন যে ভুল বুঝে হত্যা মামলা করা হয়েছে, আসলে তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আসামিদের ভুল বুঝে মামলায় যুক্ত করা হয়েছে, তাদের জামিনে আপত্তি নাই শাহিন এবং মাজেদার।
’আপোস হয়েছে কি না’- সাংবাদিকদের এরকম প্রশ্নের জবাবে বাদীপক্ষের আইনজীবী বলেন ‘হতেও পারে। আমি জানি না। এ ধরনের মামলা টাকা ছাড়া কি আপস হয়?’
দুই দালাল গাজীবুর আর আইয়ুব আলীর কী হয়েছে তা জানতে পারলাম না। জীবন্ত রিক্তা তো বিক্রি হয়েছিলো ১০ হাজারে, মৃত রিক্তা বিক্রি হলো কতোতে? সেটাও জানা গেলো না । এ যেন সিনেমার গল্প কেও হার মানালো।
১০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া ১২ বছরের রিক্তা মনির লাশ শেষ পর্যন্ত কয় টাকায় বিক্রি হলো?

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ