২০ শে মে স্বরণীয় দিন ১৯৭১ সালের চুকনগর নৃশংস গণহত্যার সেই স্মৃতি বাস্তব বাদী লেখক ও গবেষক, সরদার এম এ মজিদ

২০ শে মে স্বরণীয় দিন
১৯৭১ সালের চুকনগর নৃশংস গণহত্যার
সেই স্মৃতি
বাস্তব বাদী লেখক ও গবেষক, সরদার এম এ মজিদ
জেলা খুলনা, ডুমুরিয়া থানাধীন, চুকনগর বাজারস্থ ১৯৭১ সালের ২০শে মে, সেই বিভীষিকাময় নৃশংস গণহত্যা আজ থেকে ৫৫ বৎসর পূর্বের ঘটনা। যাহা বিশ্বের ইতিহাসে এই রকম হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা আর কোথাও সংগঠিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আনুমানিক ১০/১৫ হাজার মত শরনার্থী ভারতে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট হিসাবে চুকনগর বাজারে একত্রিতভাবে জমায়েত হতে থাকে। ১৯ই মে থেকে ২০শে মে ভোর ৭/৮ ঘটিকার মধ্য চুকনগর বাজারস্থ পাতাখোলা বিল, কাঁচাবাজার, চাঁদনী ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির ও ভদ্রানদীর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় মানুষ আর মানুষের ঢল নামতে থাকে। পুরা এলাকায় তিল পরিমান জায়গা খালি ছিল না।
হাজার হাজার লোকজন একজায়গায় সমবেত হইতেছিল ভারতে পাড়ি দেওয়ার জন্য। স্থানীয় দুষ্কৃতিকারী যাহারা ছিল তাহারা দ্রুত সাতক্ষীরা পাকিস্থান হানাদার বাহিনীদের খবর দিয়ে এনে এই গণহত্যা কান্ডটি সংঘঠিত করানো হয়েছিল। বহু দূর দুরান্ত থেকে অধিকাংশ মানুষ পায়ে হেটে, কেহ নৌকা যোগে, কেহ বিভিন্ন গাড়ী ঘোড়ায় এসে চুকনগর বাজারে পৌঁছাইয়া কেবল বিশ্রামের জন্য কেহ রান্নাভান্না কেহ সকালের নাস্তা পানি, চিড়া- মুড়ি খাওয়া দাওয়া চলছিল। আগন্তক লোকজনের মধ্য অধিকাংশ মানুষ ছিয়ানব্বই গ্রাম থেকে আসা, আর পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কুচুয়া, শরনখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনা সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ তাদের সহায় সম্বল, জমি জায়গা দোকানপাট, ঘরবাড়ী, গরু ছাগল হাঁসমুরগী সহ সকল প্রকার আসবাসপত্রের মায়া মমতা ত্যাগ করে সকলেই প্রাণ ভয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্য চুকনগর সমবেত হয়েছিল। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী খবর পেয়ে ২০শে মে সকাল ৯ ঘটিকার সময় ১টি ট্যাঙ্ক ও ১টি সাজোয়া জীপ গাড়ি নিয়া সাতক্ষীরা-চুকনগর মমহাসড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলা নামক স্থানে এসে পৌঁছায় এবং গাড়ির শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ গাড়ীর শব্দ থেমে যাওয়ায় রাস্তার পার্শ্বে পাটক্ষেতে কর্মরত মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল (৭০) নামে এক বৃদ্ধ হঠাৎ গাড়ীর শব্দ শুনে তিনি পাটক্ষেতের মধ্য কর্মরত অবস্থায় উকি মেরে দেখার জন্য দাড়ান। পাটক্ষেতে থেকে উকি মারা দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পাটক্ষেতে পূর্ব থেকে কি মুক্তিযোদ্ধারা ওঁতপেতে বসে আছে মনে করে। চিকন আলীকে দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করে। উক্ত গুলির শব্দে হাজার হাজার মানুষ দিক- বিদিক ছুটাছুটি শুরু করে দেয়, আর পাক হানাদার বাহিনী তাদেরকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাইতে থাকে কে যুবক কে বৃদ্ধা কে নারী কে পুরুষ কি শিশু এসব তাদের কোন খেয়াল ছিল না। পাতাখোলার বিল, কাচাবাজর, স্কুল মাঠ, ভদ্রা নদীর ঘাটে হাজারও মানুষকে হত্যা করে। প্রাণ ভয়ে অধিকাংশ মানুষ নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়ে। হানাদার বাহিনী নদীর বুকে গুলি করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে গেল। ইহা ছাড়া মানুষ প্রাণ ভয়ে দিক বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। কেহ দোকানের অলি-গলিতে কেহ কালভাটের মধ্যে, কেহ দোকান ভেঙ্গে ভিতরে পালানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। সকাল আনুমানিক ৯ ঘটিকা হতে ২/৩সংঘটিত হইয়াছিল। চুকনগর বাজার ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুহুর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিনত যাহা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণহত্যা। হয়ে গেল।
ভাবে কেটে আলীর চুকনগর সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষজন যাহাছিল ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বাকরুদ্ধ অবস্থায় দিনরাত কিভাে গেল কেহ বলতে পারেনি। পরদিন শুক্রবার সকালে পাটক্ষেতে হানাদার বাহিনীর হাতে ১ম নিহত চিকন মোড়লের পুত্র এরশাদ আলী পিতার খোঁজে হত্যাযজ্ঞের মাঠে যান। বিভিন্ন এলাকা থেকে হত্যাযজ্ঞ দেখার জন্য মানুষ সমবেত হতে থাকে। এরশাদ আলী তার পিতার সন্ধানের জন্য প্রতিটি লাশের নিকট দেখতে থাকে।
হঠাৎ তিনি দেখতে পান ৫/৬ মাসের একটি ছোট্ট শিশু মৃত মায়ের দুগ্ধ পান করিতেছে। তিনি কান্না জড়িত অবস্থায় শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ীতে নিয়ে যান। দুই একদিন পরে বাচ্চাটির নাম রাখেন সুন্দরী। আস্তে আস্তে লোক মুখে ছড়িয়ে পড়ল কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটির কথা। লোক মুখে জানাজানি হতে হতে, কেশবপুর থানার মঙ্গলকোটের কালিয়া গ্রামের মাদার দাস দম্পতি তাহারা নিঃসন্তান ছিলেন। তারা লোক মুখে শুনেছেন এরশাদ নামে এক ব্যক্তি হত্যাযজ্ঞের মাঠে কুড়িয়ে পাওয়া ১টি কন্যা সন্তান তার নিকট আছে। বাচ্চাটির জাতি ধর্মের কোন পরিচয় নেই। তারপর তিনি ভেবে দেখলেন মাদার দাস দম্পতি নিঃসন্তান। তিনি সহ এলাকার অন্যান্য মানুষজন যাহারা ছিল সকলে বলিল বাচ্চাটিকে তাদের দিলে ভাল হবে। কারণ তাদের কোন সন্তাদি নাই। তাহারা শিশুটিকে নিজের সন্তানের মত করে লালন পালন করিবেন। ভেবে চিন্তে বাচ্চাটিকে তাদেরকে দেওয়া হইল। উক্ত মাদার দাসের ঘরে সুন্দরী আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। ১৫ বৎসর বয়স হইলে মাদার দাস তার বিয়ের ব্যবস্থা করে। ঘুরে ফিরে সেই চুকনগরের মালতিয়া গ্রামের বাটুল দাসের সহিত তার বিবাহ হয় বাটুল দাস একজন দিন মুজুর, হত দরিদ্র। খুব কষ্টে সুন্দরীর সংসার চলতে থাকে। সংসার জীবনে সুন্দরী গর্ভজাত পর পর ২টি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহন করে। প্রথমটির নাম রাখেন সুমন দাস, দ্বিতীয়টির নাম রাখেন ডেভিড দাস। সুন্দরীকে ৭১-এর গণহত্যার মাঠে কুড়িয়ে পাওয়ার কথা আস্তে আস্তে লোকমুখে প্রচার হতে থাকে। বিভিন্ন সংগঠন, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সুন্দরীর জীবনের স্মৃতি লেখা লেখী করতে থাকে। বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচার হতে থাকে। বিভিন্ন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। অনেকে আবার সুন্দরীকে কেন্দ্র করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করতে থাকে। বাটুল দাসের ঘরে স্বামী সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে তার জীবন কেটেছে। বর্তমানে সুন্দরীর স্বামী-সন্তান, নাতী-নাতনী, নিয়ে সবাই মিলে সুখে আছেন এবং কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। চুকনগরস্থ নন্দী বাড়ীর পিছনে ১১ শতক জমির উপর তার বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বিগত আওয়ামীলীগ সরকার। আমরা চিরকৃতজ্ঞ প্রকাশ করছি। বিশ্বের ইতিহাসে এমন মর্মান্তিক ঘটনা কেহ দেখেছে কিনা আমার জানা নেই। ১৯৭১ সালের ২০শে মে সেই নৃশংস গণহত্যা কান্ডটি স্মরনীয় দিন হিসাবে পালন করিবার জন্য এবং সেই সাথে সুন্দরীর জীবনের স্মৃতিগুলি ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করার আবেদন রহিল। আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সরজমিনের তথ্য মতে। সুন্দরীর জীবনের স্মৃতিগুলো লেখার দ্বারা যদি ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি দিয়ে দেখবেন আশা রাখি। ইতি বাস্তববাদী লেকখ ও গবেষক সরদার এম, এ মজিদ, পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা।
