পোরশায় ঐতিহ্যবাহী ‘কারাম উৎসব’ পালিত

সুনীল কুমার
পোরশা (নওগাঁ) উপজেলা সংবাদদাতা
নওগাঁর পোরশায় উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী ২৬তম ‘কারাম উৎসব’ উদযাপন।
মাঠের মাঝখানে পুঁতে রাখা হয়েছে কারাম গাছের ডাল। সেই ডাল ঘিরে ঢোল ও মাদলের তালে নাচছেন সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এক দল নারী-পুরুষ। মুখে তাদের ঝুমুর গানের সুর। নৃত্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প বলছেন। আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। কারাম উৎসব সমতলের আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পাশাপাশি এটি আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার বিশেষ উদ্যোগ।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ _পোরশা উপজেলা শাখা এ আয়োজন করে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) পোরশা উপজেলার ৩নং ছাওড় ইউপি’র দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর ঝর্ণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে।
প্রধান অতিথি জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, সংসদ সদস্য, ৪৬ নওগাঁ-১ (পোরশা -সাপাহার -নিয়ামতপুর)
বিশেষ অতিথি জনাব রাকিবুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার পোরশা, নওগাঁ।
উৎসবের শুরু এক দিন আগে। শুক্রবার উপজেলার দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজা। দিনভর উপোস থাকার পর সন্ধ্যায় গ্রামের এক দল কিশোরী কারাম গাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করে। এরপর দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গ করা হয় কারাম দেবতার উদ্দেশে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে ভিড় বাড়ে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ জড়ো হন সেখানে। পুরোহিত কিচ্ছার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন কার্মা ও ধার্মা- দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন। পরে কারাম ডাল ঘিরে শুরু হয় নাচ-গান।
শনিবার ধর্মীয় বিভিন্ন আচার শেষে গান গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে আসা হয় দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর ঝর্ণা স্কুল মাঠে। সেখানে নির্ধারিত স্থানে সেটি পুঁতে দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল কারাম ডাল ঘিরে নাচ ও গান পরিবেশন করে। সবশেষে মাঠ থেকে কারাম ডাল তুলে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
আদিবাসী মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব; ডালপূজা নামেও পরিচিত এটি। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। করম দেবতার উপাসনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা ও ফসলের ভালো ফলনের জন্য প্রার্থনা করেন তারা। নৃত্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। নতুন ফসল বপনের আচার প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহযোগিতা ও ঐক্যের বন্ধনই সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
স্থানভেদে কারাম পর্ব পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলে। সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, পাহান, মাহালীসহ বিভিন্ন আদিবাসী নিজেদের রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী এ উৎসব পালন করেন।
তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা সহজ হচ্ছে না। অর্থ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় আগের মতো নিয়মিত আয়োজন হয় না। তাই ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি কারাম উৎসবকে সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবেও দেখছেন আয়োজকরা।
আয়োজকদের ভাষ্য, গান, নাচ, কিচ্ছা ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি।
বিভিন্ন উপজেলার আদিবাসীদের ৫০টি সাংস্কৃতিক দল তাদের নিজস্ব গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে। নৃত্যানুষ্ঠানে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয় ।
সভাপতিত্ব করেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পোরশা উপজেলা সভাপতি ধীরেন লাকড়া। সঞ্চালানায় আইচন পাহান সাধারণ সম্পাদক জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পোরশা উপজেলা।
সৌজন্যে_ জাতীয় আদিবাসী পরিষদ (৩নং ছাওড় ইউপি) শাখা। আদিবাসী ছাএ পরিষদ (৩নং ছাওড় ইউপি) শাখা।
পোরশা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউর রহমান, ৩নং ছাওড় ইউপি পরিষদ চেয়ারম্যান জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সিনিয়র সভাপতি আলহাজ্ব তৌফিকুর রহমান শাহ।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পোরশা উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক নিতাই চন্দ্র মুন্ডা, পোরশা উপজেলার আদিবাসী ছাত্র পরিষদ সভাপতি নিরেন পাহান, যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি নকুল পাহান, যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি পরিমল, মহিকান্ত লাকড়া মেলা পরিচালনা কমিটি, পণ্য চন্দ্র খালকো সহযোগী লক্ষীপুর গ্রাম।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ