‎মাদক সম্রাটের তাণ্ডবে চুনারুঘাট জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব; চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মিথ্যা মামলায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ
‎স্টাফ রিপোর্টার, হবিগঞ্জ:
‎হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা জুড়ে কথিত মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার ৩নং দেওরগাছ ইউনিয়নের আজিমাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মন্নাফের ছেলে আব্দুল জলিল দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং অপরাধী চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
‎ভুক্তভোগী ধোলাইপাড় গ্রামের মৃত জহুর হোসেনের ছেলে কাজল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে তাকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো হচ্ছে। কাজল মিয়ার দাবি, চুনারুঘাট বাজারের একটি বিকাশ দোকান থেকে তার কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
‎স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চুনারুঘাট থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তার বাড়ি থেকে ১৫১ পিস ইয়াবা, প্রায় ৩ কেজি গাঁজা ও নগদ টাকা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ৩৬(১) সারণির ১০(ক) ও ১৯(ক) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
‎এর আগে, গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে প্রায় ৩০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এ সময় সোহাগ মিয়া নামে একজন আটক হলেও মূল অভিযুক্ত আব্দুল জলিল পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনাতেও মাধবপুর থানা পৃথক মামলা দায়ের করে।
‎অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে এই সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের দাবি, ভারত থেকে আসা অবৈধ মাদক উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। সিন্ডিকেট সদস্যরা বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে পৌরসভা ও উপজেলার নানা স্থানে মাদক সরবরাহ করে থাকে।
‎এদিকে, গত ৮ মে ২০২৬ সকালে আশুগঞ্জ থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ টোলপ্লাজা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি প্রাইভেটকার থেকে ২১০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় রহমত আলী সুজন নামে এক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাড়ি চুনারুঘাট উপজেলার বড়াইল এলাকায় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আশুগঞ্জ থানায় পৃথক দুটি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্রও জড়িত রয়েছে। তারা পৌর এলাকার বিভিন্ন কবরস্থানের গেট, ডিম লাইটসহ নানা মালামাল চুরি করে থাকে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। ইতোমধ্যে একাধিক নিরীহ ব্যক্তি এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
‎এছাড়া গত ১০ মে বিকেল ৪টার দিকে পৌর এলাকার ধোলাইপাড় থেকে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি রঙ্গিলাকে তুলে নিয়ে দিনের আলোতে ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর দাবি, তার ব্যাগে থাকা ১০ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেয় সিন্ডিকেট সদস্য স্বপন মিয়া ও তার সহযোগীরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগী চুনারুঘাট থানা-এ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
‎স্থানীয়রা বলছেন, ২০১৬ সাল থেকে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট এলাকায় ভয়ঙ্কর প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব নয়।
‎এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদক ও অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ