মুক্তাখচিত প্রতিমায় চমক নিয়ে আসছে আশাশুনির বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির

লিংকন আসলাম, আশাশুনি ব্যুরো: শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ব্যতিক্রমী আয়োজন নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির। প্রতিবছর প্রতিমা নির্মাণে নতুনত্ব আনার চেষ্টা থাকলেও এবার যেন সেই আয়োজন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকার্যে সাজানো হচ্ছে মন্দিরের প্রতিমা। প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রতিমা দেখতে পূজা শুরুর আগেই দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেছেন।
সরেজমিনে বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন পূজা মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। প্রতিমার বিভিন্ন অংশে নিপুণভাবে বসানো হচ্ছে মুক্তা। কারুকার্য ও সাজসজ্জার কাজ শেষ হলে প্রতিমাটি আরও আকর্ষণীয় রূপ পাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের প্রতিমায় মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে মুক্তার ব্যবহার। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী নকশায় ১৩টি প্রতিমাকে সাজানো হচ্ছে। প্রতিমার বিভিন্ন অংশে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে প্রতিমাটি দেখতে এরই মধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকে পূজা শুরুর আগেই মণ্ডপে এসে নির্মাণকাজ ও প্রতিমার কারুকার্য দেখছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে চলছে নির্মাণকাজ
প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন দক্ষিণ বড়দল গ্রামের নির্মল মণ্ডলের ছেলে প্রতিমা ভাস্কর প্রকাশ মণ্ডল। তিনি গত ৫ জুলাই থেকে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রতিমার কাঠামো, অবয়ব, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকার্যের কাজ এগিয়ে চলছে।
প্রকাশ মণ্ডল বলেন, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় প্রদর্শিত বিভিন্ন মূর্তির নকশা দেখে এবং নিজের পরিকল্পনার সমন্বয়ে এবারের প্রতিমা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। মোট ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকার্য করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি কাজও শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিমা নির্মাণে নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল। মুক্তার কারুকার্য ফুটিয়ে তুলতে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লেগেছে। প্রতিমার চূড়ান্ত সাজসজ্জা শেষ হলে দর্শনার্থীরা এর পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনত্ব
মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল ও সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল জানান, বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে দীর্ঘদিন ধরেই শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবারই প্রতিমা নির্মাণে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করা হয়। এবার মুক্তার কারুকার্যের মাধ্যমে সেই ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে।
তারা বলেন, ১৭ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।
পূজাকে ঘিরে মণ্ডপ এলাকায় দর্শনার্থীদের জন্য নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার দর্শনার্থীদেরও উপস্থিতি থাকবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
একসঙ্গে বিসর্জন হবে প্রায় ১০ মণ্ডপের প্রতিমা
বিজয়া দশমীতে বড়দল ইউনিয়নের বিভিন্ন পূজা মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে আড়ংয়ের মাধ্যমে বিসর্জনের আয়োজন করা হবে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলায় অংশ নেবে।
এতে বিজয়া দশমীর দিন এলাকায় উৎসবের আমেজ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা
পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়েও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানান, মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পূজা শুরু হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন।
তাদের ভাষ্য, উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে পারে। তাই মণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আয়োজক কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
সম্প্রীতির বার্তা বড়দলে
স্থানীয় এস এম শরিফুল ইসলাম বলেন, বড়দল ইউনিয়ন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি এলাকা। এখানে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। ইউনিয়নে মসজিদের পাশাপাশি মন্দির, ইসকন মন্দির ও গির্জাও রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো উদযাপন করে থাকেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উৎসবের দিনগুলোতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আয়োজন উৎসবমুখর হয়ে উঠবে।
প্রসঙ্গত, এ বছর আশাশুনি উপজেলায় মোট ১০৫টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তাখচিত প্রতিমা এবারের দুর্গোৎসবে দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ