পোরশায় ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস

পোরশায় ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস
সুনীল কুমার
পোরশা (নওগাঁ) উপজেলা সংবাদদাতা
নওগাঁর পোরশা উপজেলার সারাইগাছী মোড়ে পালিত ১৭১তম মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পোরশা উপজেলা শাখার উদ্যোগে সারাইগাছী মোড়ে বর্ণাঢ্য র্যালি আলোচনা সভা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়।
৩০ জুন ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম। সাঁওতালদের এ বিদ্রোহ, সশস্ত্র সংগ্রাম ও অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ মুক্তিকামী মানুষের কাছে আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক দুই ভাই-সিধু মুরমু ও কানু মুরমু স্মরণে ও শ্রদ্ধায় সাঁওতালদের অনেকেই দিনটিকে সিধু-কানু দিবস বলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় দালাল সামন্ত জমিদার, সুদখোর, তাদের লাঠিয়াল বাহিনী, দারোগা-পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব-এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে রুখে দাঁড়ান সাঁওতালরা। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের দুই বোন ফুলোমনি মুরমু ও ঝালোমনি মুরমু।
ভারতের ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকা দামিন-ই-কোহ্ বা ‘পাহাড়ের ওড়না’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভাগলপুরের ভগনা ডিহি গ্রামের সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব-এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে দামিন-ই-কোহ্ অঞ্চলে সংঘটিত হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভগনা ডিহি গ্রামে ৪০০ গ্রামের প্রতিনিধি ১০ হাজারেরও বেশি সাঁওতাল কৃষকের বিরাট জমায়েত হয়। জমায়েতে সিধু-কানু ভাষণ দেন। এ সভায় সিদ্ধান্ত হয়, অত্যাচারী শোষকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে। এখন থেকে কেউ জমির কোনো খাজনা দেবে না ও প্রত্যেকেরই যত খুশি জমি চাষ করার স্বাধীনতা থাকবে। আর সাঁওতালদের সব ঋণ এখন বাতিল হবে। তাঁরা মুলুক দখল করে নিজেদের সরকার কায়েম করবেন।
সমবেত সাঁওতাল কৃষকেরা সেদিন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছিলেন। ভগনা ডিহি গ্রামের ওই সভার শপথ ছিল বিদ্রোহের শপথ। বিদ্রোহের মূল দাবি ছিল ‘জমি চাই, মুক্তি চাই’। জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের শোষণ ও জুলুম থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির সঙ্গে উৎপাদনের কাজ ও জীবন ধারণ করার সংকল্প নিয়ে সাঁওতাল কৃষকেরা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ান। তাঁদের এ বিদ্রোহের সঙ্গে যোগ দেন এলাকার শোষিত, বঞ্চিত বাঙালি ও বিহারি হিন্দু-মুসলমান গরিব কৃষক এবং কারিগরেরা। সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়ে উঠেছিল সব সম্প্রদায়ের গরিব জনসাধারণের মুক্তিযুদ্ধ।
প্রতিবছর এই দিনে সিধু-কানুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি, শোভাযাত্রা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ও বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ও দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক সিধু-কানুসহ সব আত্মদানকারীকে। উদ্যাপন করে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস।
এবারও বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকীতে মেরিনা মুর্মুর সভাপতিত্বে আইচন পাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান।
বিশেষ অতিথি জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রোম, প্রেসিডিয়াম সদস্য মহেন্দ্র পাহান, কেন্দ্রীয় যুব জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সাবিত্রী হেমব্রোম, পোরশা উপজেলা জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সাংগঠনিক সম্পাদক নিতাই চন্দ্র পাহান কেন্দ্রীয় আদিবাসী ছাত্র পরিষদ সভাপতি অনিল গজাড়।
এছাড়াও উপস্থিত আদিবাসী ছাত্র পরিষদ পোরশা শাখার সভাপতি নিরেন পাহান, নিতপুর ইউপি পরিষদ সাধারণ সম্পাদক রাজেন্দ্রনাথ শিং, গাঙ্গুরিয়া ইউপি পরিষদ সভাপতি ভাদয়া হাসদা, ঘাটনগর ইউপি পরিষদ সাধারণ সম্পাদক বুধা লাকড়া, ছাওড় ইউপি আদিবাসী নেতা পরিমল, খোকা তিগ্যাসহ বিভিন্ন গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
