ফয়জুল্যাপুরে শতবর্ষ পেরিয়ে আসা বয়োবৃদ্ধ আব্দুল কাদেরের নাতনির ভিক্ষার টাকায় চলছে জীবন প্রদীপ

ফয়জুল্যাপুরে শতবর্ষ পেরিয়ে আসা বয়োবৃদ্ধ আব্দুল কাদেরের নাতনির ভিক্ষার টাকায় চলছে জীবন প্রদীপ
মোঃ আরশাদ আলী সাতক্ষীরা থেকে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের ফয়জুল্যাপুর গ্রামে শতবর্ষ পেরিয়ে আসা বয়োবৃদ্ধ আব্দুল কাদের সরদার বাস করেন বাঁশের খুটিতে পুরানো ছেঁড়া পলিথিনে মোড়ানো বিদ্যুতের আলো বিহীন জরাজীর্ণ ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে প্রতিবন্ধী নাতনির ভিক্ষার টাকায় চলছে তার জীবনের চাকা। মাথার উপর চাল ও ঘেরাবেড়ার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি এলে পলিথিন বেয়ে টপটপ পানি পড়ে। রোদ উঠলে ঘরের ভেতরটাও হয়ে ওঠে আগুনের মতো। এই ঘরেই বসবাস করেন শতবর্ষ পেরিয়ে আসা বৃদ্ধ আব্দুল কাদের সরদার। নামের পাশে “সরদার” থাকলেও সমাজে তার কোনো সরদারি নেই। আছে শুধু অভাব, অসহায়ত্ব আর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। পুত্র সন্তান না থাকায় প্রতিবন্ধী নাতনির ভিক্ষার টাকায় চলছে তার জীবনের চাকা। তিন কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের স্বামীর ঘরে।
আব্দুল কাদের সরদারের বয়স ঠিক কত, তা তিনিও বলতে পারেন না। গ্রামের মানুষের হিসেবে তিনি শতবর্ষ পেরিয়ে গেছেন। চোখ দুটো কোটরাগত, গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে, কাঁপা কাঁপা হাতে লাঠি ভর দিয়ে চলেন। এক সময় জমি-জমা, সহায়-সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। এখন তার কিছুই নেই। স্ত্রী মারা গেছেন ১৫-১৬ বছর আগে শ্বশুরবাড়িতে থাকা গরিবের মেয়ে, তারাও নিজের সংসার নিয়ে হিমশিম খায়। বাবার খোঁজ নিতে মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।
বৃদ্ধ কাদেরের সংসার এখন ৩ জনের। তিনি নিজে, তার প্রতিবন্ধী নাতনি আর নাতনির দুই বছর বয়সের ছোট্ট মেয়ে। নাতনির মেয়েটি মাত্র দুই বছরের শিশু।
সংসার চলে বয়স্ক ভাতার ৬০০টাকা ও প্রতিবন্ধী ভাতার ৮৩৩টাকায়। একটা কাদেরের নামে, আরেকটা প্রতিবন্ধী নাতনির নামে।
এই টাকা দিয়ে চাল, ডাল, ওষুধ, শিশুর খাবার—সব কিনতে হয়। মাসের ১০ দিন যেতেই টাকা শেষ। পাড়া-প্রতিবেশীর দেওয়া এক বেলা খাবারের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী নাতনি আহ্লাদীর ভিক্ষার টাকায় চলছে তাদের জীবনের চাকা।
ফয়জুল্যাপুর গ্রামে কারেন্ট গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু কাদেরের ঘরে আজও বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। কারণ একটাই—টাকা নেই। মিটার নিতে, তার কিনতে, বিল দিতে যে খরচ, সেই সামর্থ্য তার নেই। তাই সন্ধ্যা নামলেই ঘরে জ্বলে মাটির প্রদীপ। হ্যারিকেন কেনারও সামর্থ্য নেই।
প্রদীপের আলোর মতো নিভু নিভু করছে বৃদ্ধ আব্দুল কাদেরের জীবনের আলো। মাঝে মাঝে বাতাসে প্রদীপ নিভে যায়। তখন অন্ধকারে হাতড়ে আবার দেশলাই খোঁজেন। তিনি বলেন, “বাবা, আমার জীবন প্রদীপটাও এই প্রদীপের মতো নিভু নিভু করছে। কখন নিভে যায়, নিজেও জানি না।”
পলিথিনের ছাউনি: ঝড়-বৃষ্টির সাথী
তার ঘরটাকে ঘর বলতে লজ্জা হয়। ৬ ফুট বাই ৮ ফুটের মতো জায়গা। বেড়া নেই, দরজা নেই। রাতে শোয়ার জন্য আছে একটা ছেঁড়া কম্বল আর পাটি। শীত আসলে কাঁপতে কাঁপতে রাত কাটে। বর্ষায় পলিথিন ফুটো হয়ে পানি পড়ে মাথার উপর। তখন পলিথিনের নিচে প্লাস্টিকের বালতি পেতে রাখেন। ঝড় হলে ভয়ে সারাত জেগে থাকেন। পাছে পলিথিন উড়ে যায়, মাথার উপর আকাশ নেমে আসে।
সরকারী আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা শতশত ঘর তৈরি করা হলে একটা ঘরের জন্য অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘর তার কপালে জোটেনি।
মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত শতবর্ষী এই মানুষটির জীবনে একটি চাহিদাও পূর্ণ হয়নি। দুই বেলা পেট ভরে ভাত জোটে না। ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেই দিন কাটান। অসুখ-বিসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়না।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে বয়োবৃদ্ধ আব্দুল কাদের সরদারের করুন আকুতি “আমি আর কয়দিন বাঁচবো? মরার আগে দুমুঠো ভাত চাই, থাকার জন্য মাথার উপর একটু ছাউনি আর বিদ্যুৎ চাই ”
ফিংড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, “কাদের চাচার বিষয়টি আমরা জানি। তাকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি ঘরের তালিকায় নাম তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বরাদ্দ কম, চাহিদা বেশি। তারপরও মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে জানাবো।”
স্থানীয়রা বলছেন, কাদেরের মতো মানুষদের জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। একটা টিনের ঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ ও একটা সোলার প্যানেল, মাসে সামান্য বাজার এইটুকুই তার শেষ জীবনটাকে একটু শান্তি দিতে পারে। কিন্তু কেউ তার খোঁজ রাখে না।অথচ ভোট আসলে পোষ্টারে পোষ্টারে লেখা থাকে বিশিষ্ট সমাজ সেবক, গরীবের বন্ধু, জনদরদী, জননেতাদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও এ জনপদে তাদের এখন তাদের কোন হদিস পাওয়া যায় না।
আব্দুল কাদের সরদার বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছেন। শত বছর বয়সেও হার মানেননি। কিন্তু এই যুদ্ধে তিনি একা। রাষ্ট্র, সমাজ, আমরা সবাই যদি একটু পাশে দাঁড়াই, তাহলে হয়তো পলিথিনের ছাউনির বদলে টিনের চাল হবে। প্রদীপের বদলে জ্বলবে বিদ্যুতের আলো।
মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সময় এখনই। কারণ কাদেরের জীবন প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে। এই প্রদীপ নিভে গেলে, একটি শতবর্ষের গল্পও নিভে যাবে। সাথে নিভে যাবে তিনটি অসহায় প্রাণের শেষ ভরসা।
সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা:
নাম: আব্দুল কাদের সরদার
গ্রাম: ফয়জুল্যাপুর, ডাক: ব্রহ্মরাজপুর
উপজেলা: সাতক্ষীরা সদর, জেলা: সাতক্ষীরা
মোবাইল: ০১৩১১০৫৪৮৩৫ (নগদ)
