হাসপাতালের বিল দিতে ধার, বুশরায় জমা ৪ লাখ থাকলেও টাকা পেলেন না সাংবাদিক রনি

তাপস কুমার ঘোষ, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
কোলে সদ্যোজাত সন্তান, হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর শয্যাশায়ী স্ত্রী। সামনে চিকিৎসার বড় অঙ্কের বিল। অথচ জরুরি মুহূর্তে হাতে নেই প্রয়োজনীয় টাকা। আরও বেদনাদায়ক বিষয় পরিবারের সঞ্চয় হিসেবে বুশরা ইসলামী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে জমা রয়েছে ৪ লাখ টাকা। সেই আমানত থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ফেরত চেয়েও পাননি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের সাংবাদিক রেদওয়ান ফেরদৌস রনি। ফলে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে শেষ পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা ধার করতে হয়েছে তাকে।
সাংবাদিক রেদওয়ান ফেরদৌস রনি জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ সমাচার’-এর কালিগঞ্জ প্রতিনিধি এবং রিপোর্টার্স ক্লাবের নির্বাহী সদস্য। তিনি কালিগঞ্জ উপজেলার বুশরা গ্রুপের একজন আমানতকারী।
রনি জানান, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তার বাবার পেনশনের জমানো ৪ লাখ টাকা বুশরা গ্রুপে আমানত হিসেবে রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনের সময় এই সঞ্চয় পরিবারের কাজে আসবে এমন প্রত্যাশাতেই টাকা জমা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে সেই অর্থ হাতে না পাওয়ায় তাকে চরম আর্থিক দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করে রনির স্ত্রীর জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ায় দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে সিজারিয়ান অপারেশনের পাশাপাশি অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারও করতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর জন্ম নেয় তাদের সন্তান।
একদিকে নবজাতকের আগমন, অন্যদিকে অস্ত্রোপচারের পর মায়ের চিকিৎসা সব মিলিয়ে পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হয় উদ্বেগ। চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়তে থাকে। ১৩ আগস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় সামনে আসে বড় অঙ্কের বিল। এ সময় নিজের আমানতের টাকা পাওয়ার আশায় বুশরা গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাংবাদিক রনি।
রনি অভিযোগ করেন, বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, পরিচালক ইকবাল কবীর পলাশ এবং এরিয়া ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের কাছে গিয়ে তিনি নিজের পারিবারিক সংকটের কথা জানান। নিজের জমা ৪ লাখ টাকা থেকে অন্তত ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগ ও অনুরোধের পরও তিনি টাকা পাননি বলে অভিযোগ তার।
সাংবাদিক রেদওয়ান ফেরদৌস রনি বলেন, আমার স্ত্রী হাসপাতালে, সদ্য সন্তান হয়েছে। চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা প্রয়োজন ছিল। বুশরায় আমার নিজের টাকা জমা আছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই টাকাটাও পেলাম না।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্ন সময় আশ্বাস ও সময় দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত হাতে ফেরত দেওয়া হয়নি তার আমানতের কোনো অর্থ। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ধার নিতে হয়েছে তাকে।
রনির এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয় বুশরা গ্রুপে টাকা জমা রাখা অন্যান্য আমানতকারীর মধ্যেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন আমানতকারীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা নিয়মিত সঞ্চয় ও আমানত করে এলেও প্রয়োজনের সময় নিজেদের জমা টাকা ফেরত পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কারও সন্তানের চিকিৎসা, কারও পড়াশোনার খরচ, আবার কারও পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন—বিভিন্ন কারণে আমানতের টাকা উত্তোলনের প্রয়োজন হলেও তা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, টাকা ফেরতের জন্য বারবার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন আমানতকারীর অভিযোগ, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বুশরা গ্রুপের কার্যক্রম ও প্রকল্প থাকলেও গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যালয় বন্ধ থাকা এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভও বাড়ছে বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরতের পাশাপাশি বুশরা গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রম, আমানত সংগ্রহ, সম্পদ এবং অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তারল্য সংকটের কারণে আমরা গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছি না।
কবে নাগাদ গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ কোনো প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখার পর তা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একদিকে হাসপাতালের বিল, অন্যদিকে কোলে সদ্যোজাত সন্তান এমন সংকটময় সময়ে নিজের জমানো টাকা থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়েছে সাংবাদিক রেদওয়ান ফেরদৌস রনিকে। তার এই অভিজ্ঞতা এখন বুশরা গ্রুপে আমানত রাখা অনেক গ্রাহকের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে বিপদের দিনে যদি নিজের জমানো টাকাই সময়মতো পাওয়া না যায়, তাহলে সেই আমানতের নিরাপত্তা কোথায়?

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ